বাজারের ত্রিমুখী সমীকরণ: ক্রিপ্টোতে লিকুইডেশনের ধাক্কা, তেলের দরপতন এবং খনি শ্রমিকদের টিকে থাকার লড়াই

বিটকয়েন আর ইথারের নেতৃত্বে ক্রিপ্টো মার্কেটে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল এক লিকুইডেশন হয়ে গেল সম্প্রতি। এই ধসের কারণে জুনের শুরুর পর বিটকয়েন এই প্রথম এতটা নিচে নামতে বাধ্য হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, মার্কেট একেবারে ধসে পড়েনি। মাইক্রনের ফাটাফাটি আর্নিংস রিপোর্ট এবং এসকে হাইনিক্সের (SK Hynix) যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত হওয়ার খবরে এআই (AI) ট্রেডিংয়ের পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে। ক্রিপ্টো মার্কেট যখন পড়তির দিকে, তখন এই এআই ট্রেডই মূলত বাজারটাকে কিছুটা হলেও স্থির রেখেছে।

বিটকয়েনের এই দরপতন সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে এর মাইনারদের। গত এক বছর ধরেই মাইনারদের আয় ধারাবাহিকভাবে কমতির দিকে। বর্তমানে ৭ দিনের মুভিং এভারেজ অনুযায়ী তাদের দৈনিক আয় প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে, যা গত গ্রীষ্মেও ৫০ মিলিয়নের ওপরে ছিল। ট্রানজ্যাকশন ফি থেকে আয় এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়—আড়াই লাখ ডলারেরও কম, যা মূল ব্লক সাবসিডির তুলনায় স্রেফ রাউন্ডিং এরর হিসেবেই ধরা যায়। জেপি মর্গানের হিসাব বলছে, বিটকয়েন মাইন করার গড় খরচ এখন ৭৮,০০০ ডলার, অথচ বাজারে এর দাম ঘুরপাক খাচ্ছে ৬২,৫০০ ডলারের আশেপাশে। এই ঘাটতিটা টানা পাঁচ মাস ধরে চলছে, যা বর্তমান মার্কেট সাইকেলে সর্বোচ্চ। ইতিহাস বলে, প্রোডাকশন কস্ট সাধারণত দামের জন্য একটা সফট ফ্লোর হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।

নেটওয়ার্কের ডেটা ঘাঁটলে এই খনি শ্রমিকদের চাপের বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ মাইনার লোকসানে আছেন। গত ছয় মাসে বিটকয়েনের দামের সাথে মাইনিং ডিফিকাল্টির বিটা (beta) বেড়ে ০.৬২-তে দাঁড়িয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, যাদের মাইনিং খরচ বেশি, তারা টানা লোকসান গোনার বদলে বাজারের দামের সাথে তাল মিলিয়ে মেশিন চালু বা বন্ধ রাখছেন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে মাইনিং ডিফিকাল্টি এক ধাক্কায় ১০% কমে যায়। টিকে থাকার জন্য প্রথম প্রান্তিকেই পাবলিক মাইনাররা ব্যালেন্স শিটের ওপর ভরসা করেছেন এবং অপারেটিং খরচ মেটাতে প্রায় ৩২,০০০ বিটকয়েন বিক্রি করে দিয়েছেন। পরবর্তী হালভিং আরও প্রায় দু’বছর দূরে। ফি থেকে আয় যেহেতু তলানিতে, তাই এই মুহূর্তে মাইনারদের লাভের মুখ দেখাটা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিটকয়েনের দাম বাড়ার ওপর।

ক্রিপ্টোর এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মাঝে সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে তেলের বাজার হয়ে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৭২.৪৮ ডলারের নিচে নেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর তেলের দাম যতটুকু বেড়েছিল, তার পুরোটাই এখন উধাও। কারণ, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে এবং বাজারে তেলের সাপ্লাই এখন প্রচুর। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ট্রেড হচ্ছে ৬৯ ডলারের কাছাকাছি। সস্তা তেল মূল্যস্ফীতির চাপ কমায়। আর মূল্যস্ফীতি কমলে ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) হয়তো তাদের কট্টর বা ‘হকিশ’ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসবে। চেইন রিঅ্যাকশনটা সোজা: তেলের দাম কমল, এরপর মূল্যস্ফীতি কমল, ফেড কিছুটা নমনীয় হলো এবং শেষমেশ বিটকয়েনের মতো রিস্কি অ্যাসেটগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গা পেল। তবে এই পুরো চক্রটা কাজ করতে কয়েক মাস সময় লাগে, কয়েক দিন নয়। তাই তেলের এই দরপতন এখনই কোনো ম্যাজিক দেখাবে না, তবে সামনের দিনগুলোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বড় টেইলউইন্ড।

বর্তমান বাজারের এই বাস্তবতার মধ্যেও কিছু নির্দিষ্ট প্রজেক্ট নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আশার পারদ তুঙ্গে। যেমন, গত ২৪ ঘণ্টায় ডিফাই (DeFi) প্রটোকল আভে-র (Aave) টোকেন প্রায় ১৫% লাফিয়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এর পেছনে মূল কারণ হলো, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ AAVE-র দাম ৩,৫০০ ডলার হওয়ার একটা বিশাল পূর্বাভাস দিয়েছে! এই টার্গেট দিয়েছেন ব্যাংকের গ্লোবাল হেড অব ডিজিটাল অ্যাসেট রিসার্চ, জিওফ কেন্ড্রিক। গত সপ্তাহে তিনি ইউনিসয়াপের (UNI) জন্যও ১০০ ডলারের টার্গেট দিয়েছিলেন।

কেন্ড্রিকের থিসিস হলো, ডিফাই মার্কেট ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৭ গুণ বড় হবে এবং আভে ডিসেন্ট্রালাইজড লেন্ডিংয়ে তাদের হারানো আধিপত্য পুনরায় ফিরে পাবে। তার মতে, বছর শেষে এটি ১৮০ ডলারে পৌঁছাবে এবং এরপরের তিন বছরে ধাপে ধাপে ৬০০, ১,২০০ এবং ২,২০০ ডলারের মাইলফলক ছোঁবে। তবে আভে-র সাম্প্রতিক অতীত কিন্তু মোটেও মসৃণ নয়। গত এপ্রিলে লেন্ডিং প্ল্যাটফর্ম কেল্পডাও-তে (KelpDAO) ২৯১ মিলিয়ন ডলারের হ্যাকের ধাক্কা আভে-তেও এসে লাগে। এতে লিকুইডিটি ক্রাইসিস তৈরি হয় এবং তাদের ডিপোজিট ৪৪ বিলিয়ন থেকে এক ধাক্কায় ২৩ বিলিয়নে নেমে আসে। লেন্ডিং মার্কেটে তাদের শেয়ার ৫৯% থেকে কমে ৩৮% হয়ে যায়।

তাছাড়া, কেন্ড্রিকের এই বিশাল টার্গেট এমন কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা এখনো বাস্তবে ঘটেইনি। তার মডেলের অন্যতম ভিত্তি হলো ‘আভে হরাইজন’ (Aave Horizon)—যার মাধ্যমে ট্র্যাডিশনাল ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনচেইনে ঋণগ্রহীতা হিসেবে আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্যোগটি এখনো সম্পূর্ণ পরীক্ষিত নয়। ২০২১ সালে আভে-র সর্বোচ্চ দাম (ATH) ছিল ৬৬১ ডলার। অর্থাৎ, ২০৩০ সালের টার্গেট ছুঁতে হলে একে আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডের চেয়েও অন্তত পাঁচ গুণ বেশি দামে পৌঁছাতে হবে। কেন্ড্রিকের ইউনিসয়াপ মেথডলজি নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছিল, আভে-র ক্ষেত্রেও সেই একই সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মার্কেট এখন এমন এক অদ্ভুত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে চলছে টিকে থাকার রূঢ় বাস্তবতা, আর অন্যদিকে বোনা হচ্ছে বহুদূরের সোনালী স্বপ্ন।