অ্যামাজনে বড় রদবদল: এআই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কর্মী ছাঁটাই ও স্টোর বন্ধের ঘোষণা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে প্রযুক্তির বাজারে টিকে থাকার লড়াইটা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং ব্যবসায়িক কৌশল ঢেলে সাজাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন বড় ধরনের রদবদলের পথে হাঁটছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানটি হাজারো কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের ফিজিক্যাল বা স্বশরীরে গিয়ে কেনাকাটার দোকানগুলোর কার্যক্রমও গুটিয়ে নিচ্ছে।

এআই যুদ্ধের প্রভাবে কর্মী ছাঁটাই

অ্যামাজন জানিয়েছে তারা প্রায় ১৬,০০০ করপোরেট কর্মীকে ছাঁটাই করছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এটি প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় বড় ছাঁটাইয়ের ঘটনা; এর আগে গত অক্টোবরেও তারা ১৪,০০০ কর্মীকে বিদায় জানিয়েছিল। সব মিলিয়ে অ্যামাজনের মোট অফিস কর্মীর প্রায় ৯ শতাংশ এই ছাঁটাইয়ের কবলে পড়ছেন। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতেই এই কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অ্যামাজনের হিউম্যান রিসোর্সেস বিভাগের প্রধান বেথ গালেটি এক ব্লগ পোস্টে উল্লেখ করেছেন, প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যেই তারা অপ্রয়োজনীয় পদগুলো কমিয়ে আনছেন।

সিইও অ্যান্ডি জ্যাসি চাইছেন অ্যামাজন যেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘স্টার্টআপ’ হিসেবে কাজ করে। ওয়ালমার্টের পরেই আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে সাড়ে তিন লাখের বেশি করপোরেট কর্মী রয়েছেন। জ্যাসির মতে, এআই প্রযুক্তির কারণে পুরো প্রযুক্তি খাত ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে, তাই অ্যামাজনকেও পরিস্থিতির সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা এবং ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে কম্পিউটিং পাওয়ার ও ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরির যে লড়াই চলছে, তাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাই খরচ কমানোর চেয়েও কাজের দক্ষতা বাড়ানোই এখন জ্যাসির মূল লক্ষ্য।

ছাঁটাই প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বুধবার থেকেই এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া কার্যকর শুরু হয়েছে। তবে যারা চাকরি হারাচ্ছেন, তাদের এখনই পথে বসতে হচ্ছে না। অধিকাংশ কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই অন্য কোনো পদে আবেদনের জন্য ৯০ দিনের সময় দেওয়া হবে। যারা নতুন কাজ পাবেন না, তাদের নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হবে। অবশ্য এই ঘোষণার প্রক্রিয়াটি খুব একটা মসৃণ ছিল না। মঙ্গলবার রাতে ভুলবশত একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইল কর্মীদের কাছে চলে যায়, যেখানে এমন একটি ব্লগ পোস্টের উল্লেখ ছিল যা তখনো প্রকাশই করা হয়নি। পরে বুধবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্লগ পোস্টটি সামনে আসে। বেথ গালেটি অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, ছাঁটাইয়ের এই বিষয়টি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হবে না, তবে অ্যামাজন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জনবল নিয়োগ অব্যাহত রাখবে।

খুচরা ব্যবসায় বড় পরিবর্তন

শুধু কর্মী ছাঁটাই নয়, অ্যামাজন তাদের খুচরা ব্যবসার কৌশলেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দিয়েছে যে তারা তাদের ‘অ্যামাজন ফ্রেশ’ এবং ‘অ্যামাজন গো’ গ্রোসারি শপগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দিচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার উডল্যান্ড হিলসে প্রথম দোকান খোলার মাত্র ছয় বছর পর এই সিদ্ধান্ত এল। এর ফলে ক্যালিফোর্নিয়া, নর্থ হলিউড, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং এনসিনোসহ বিভিন্ন এলাকার ২২টি স্টোর বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কারণ অনলাইনে অর্ডার করে একই দিনে পণ্য ডেলিভারি পাওয়ার সুবিধাটি অনেক এলাকাতেই চালু থাকবে। অ্যামাজন এখন মূলত তাদের ‘হোল ফুডস’ ব্র্যান্ডের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন ডলারে কেনা এই হেলথ-ফুড চেইনটিকে ঘিরেই এখন তাদের মূল পরিকল্পনা। বন্ধ হতে যাওয়া ফ্রেশ এবং গো শপগুলোর অনেকগুলোকেই হোল ফুডস-এ রূপান্তর করা হবে। আগামী কয়েক বছরে আরও শতাধিক নতুন হোল ফুডস আউটলেট খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।