ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসি এমন একটি নাম, যিনি গত দেড় দশক ধরে মাঠের খেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। বর্তমানে পিএসজির হয়ে মাঠ মাতালেও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সতীর্থদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে পিএসজিতে তার সতীর্থ সার্জিও রামোসের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অবসর পরবর্তী জীবন নিয়ে মেসির সাম্প্রতিক মন্তব্য ফুটবল পাড়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুরোনো বৈরিতা ভুলে একই লক্ষ্য
একসময়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার হয়ে দীর্ঘদিন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছেন সার্জিও রামোস ও লিওনেল মেসি। মাঠের সেই উত্তপ্ত দ্বৈরথ এবং মেজাজ হারানোর দৃশ্য এখন অতীত। বর্তমানে পিএসজির জার্সিতে দুজনেই লড়ছেন একই লক্ষ্যের জন্য। পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই এই দুই তারকার রসায়ন নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, এমনকি সংবাদমাধ্যমে তাদের সম্পর্ক ভালো নয় বলেও খবর রটেছিল। তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সেই গুঞ্জন একপ্রকার হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার রামোস।
রামোস অকপটে স্বীকার করেছেন যে, সতীর্থ হিসেবে মেসিকে পাওয়াটা তার জন্য দারুণ উপভোগ্য। তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে উল্লেখ করে রামোস বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এখন এক, আর তা হলো পিএসজির জয় নিশ্চিত করা। মেসির সঙ্গে আমার সম্পর্ক চমৎকার এবং আমরা একে অপরকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি। তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়ার চেয়ে সতীর্থ হিসেবে পাওয়াটা নিঃসন্দেহে অনেক স্বস্তির।” রামোস আরও জোর দিয়ে বলেন, খেলোয়াড়দের বিচার করা উচিত তাদের পারফরম্যান্স দিয়ে, বয়স দিয়ে নয়। তার মতে, মেসি এখনও বিশ্বসেরাদের একজন এবং তাকে দলে পাওয়াটা সৌভাগ্যের বিষয়।
কোচ নয়, লক্ষ্য যখন ক্লাবের মালিকানা
রামোস যখন মেসির বর্তমান পারফরম্যান্স নিয়ে মুগ্ধ, তখন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার নিজেই ভাবছেন তার বুট জোড়া তুলে রাখার পরের জীবন নিয়ে। লুজু টিভিকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে মেসি তার অবসর পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ফুটবল থেকে অবসরের পর ডাগআউটে কোচ হিসেবে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছে তার নেই। বরং তিনি নিজেকে দেখছেন ক্লাবের বোর্ডরুমে, একজন মালিক হিসেবে।
মেসি বলেন, “সত্যি বলতে, কোচ হিসেবে আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না। ম্যানেজিংয়ের ধারণাটা আমার পছন্দ, তবে মালিকানা বা অন্য কোনো ভূমিকার মধ্যে বেছে নিতে হলে আমি মালিক হওয়াটাকেই প্রাধান্য দেব।” তবে এই মালিকানা কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই তার এই ভাবনা। তিনি একেবারে শূন্য থেকে একটি ক্লাব গড়ে তুলতে চান, যেখানে তরুণ খেলোয়াড়রা নিজেদের বিকাশের সুযোগ পাবে।
ভবিষ্যতের পথে প্রথম পদক্ষেপ
মেসির এই পরিকল্পনা কেবল কথার কথা নয়, বরং বাস্তবেও তিনি এর প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করেছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে খুব নীরবে উরুগুয়ের একটি নিম্ন-বিভাগের ক্লাব ‘ডিপোর্টিভো এলএসএম’-এর অংশীদার হয়ে মালিকানায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। এই উদ্যোগে তার সঙ্গে আছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুইস সুয়ারেজ। এছাড়াও নিজ দেশ আর্জেন্টিনায় তার পরিবার ‘লিওনেস দে রোসারিও এফসি’ নামের একটি ক্লাব পরিচালনা করছে, যা বর্তমানে আর্জেন্টিনার চতুর্থ স্তরের লিগে খেলছে।
মাঠের বাইরের মেসি: অন্তর্মুখী ও গোছানো
সাক্ষাৎকারে ফুটবলার পরিচয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক জগত নিয়েও কথা বলেছেন মেসি। নিজেকে কিছুটা ‘অদ্ভুত’ ও ভীষণ গোছানো স্বভাবের মানুষ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “আমি একা থাকতে পছন্দ করি এবং নিজের মতো সময় কাটাতে ভালোবাসি।” বার্সেলোনায় থাকাকালীন তিনি থেরাপি নিতেন বলেও স্বীকার করেছেন। নিজের সমস্যাগুলো মনে চেপে রাখার প্রবণতা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখেছেন। মাঠের জাদুকর মেসি যে মাঠের বাইরেও একজন দূরদর্শী ও সংবেদনশীল মানুষ, তার এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই তার প্রমাণ।










